Tuesday, December 6, 2022

শিলচরের নেতাদের নিয়ে হিমন্তের সঙ্গে কৃষেন্দুর বার্তালাপে সরগরম

নিজস্ব প্ৰতিবেদন : শহরের জনপদ থেকে বন্যার জল যেভাবে সরছে, ঠিক একইভাবে শাসক দলের জনপ্ৰতিনিধিদের বিরুদ্ধে গণক্ষোভ নিয়ে দল ও সরকারের ভেতরে থাকা মূল্যায়নও প্ৰকাশ্যে আসতে শুরু করেছে৷ শিলচরের সাংসদ ডাঃ রাজদীপ রায় ও বিধায়ক দীপায়ন চক্রবৰ্তীর বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় মানুষের ক্ষোভ সুনামির আকার নিয়েছে৷ তাঁরা ফেসবুকে কোনও কিছু পোস্ট করলেই মানুষ এসে বীভৎসভাবে ট্ৰোল করতে শুরু করেন৷ এ নিয়ে রাজ্য সরকার বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্ৰী ড.হিমন্তবিশ্ব শৰ্মাও যে রীতিমতো বিচলিত, তা শুক্রবার নিজেই বুঝিয়ে দিয়েছেন৷

গত দশ দিনের মধ্যে শুক্রবার তৃতীয়বার বরাক উপত্যকার বানভাসি এলাকার খোঁজ নিতে শিলচরে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্ৰী৷ প্ৰথমে তিনি উড়ে যান করিমগঞ্জের শনবিল এলাকায়৷ এই গোটা সফরই মুখ্যমন্ত্ৰীর ফেসবুক পেজে লাইভ করা হচ্ছিল৷ শনবিলের হাওরে এনডিআরএফের বোটে সওয়ার হয়েছিলেন তিনি৷ সঙ্গে ছিলেন মন্ত্ৰী জয়ন্তমল্ল বরুয়া, রাতাবাড়ির বিধায়ক বিজয় মালাকার এবং পাথারকান্দির বিধায়ক কৃষেন্দু পাল৷ বোটে বসে আশপাশের জলবন্দি এলাকা সম্পৰ্কে খোঁজ নিচ্ছিলেন মুখ্যমন্ত্ৰী৷

বিজয় মালাকার ও কৃষেন্দু পাল তাঁকে জায়গা ও পরিস্থিতি সম্পৰ্কে অবহিত করে যাচ্ছিলেন৷ একসময় হঠাৎ করেই মুখ্যমন্ত্ৰীকে উদ্দেশ্য করে কৃষেন্দু পালকে বলতে শোনা যায়, ‘শিলচরে লিডাররা কাজ করেননি৷’ সঙ্গে সঙ্গেই হিমন্তবিশ্ব বলে ওঠেন, ‘শিলচরে এঁদের উপর (পড়ুন রাজদীপ, দীপায়ন) মানুষের প্ৰচণ্ড রাগ ছিল৷ বা…৷ আমি এসে…(এরপর মুখ্যমন্ত্ৰী কথা ঢাকা পড়ে যায়)৷’ তারপর ফের মুখ্যমন্ত্ৰীকে প্ৰশ্ন করতে শোনা যায়, ‘এঁরা (পড়ুন, রাজদীপ-দীপায়ন) গণ্ডগোল ঠিক কী করেছিল?’ এইসময় কৃষেন্দুর পাশে বসা জয়ন্তমল্ল বরুয়া মুখ্যমন্ত্ৰীকে বলেন, ‘আসলে তাঁদের সমস্যাটা হল, এমন পরিস্থিতিতে যেভাবে ফিল্ডে নামতে হয়, তা না করে ঘর থেকেই ফেসবুক, ঘর থেকেই অমুক-তমুক করে সময় কাটিয়েছেন৷ অফিসে গিয়ে বসে রইলেন৷ ডিসির সঙ্গে মিটিং করলেন..৷’ পাশ থেকে কৃষেন্দুকে তখন বলতে শোনা যায়, ‘ এইসব তো পাবলিক পছন্দ করে না৷ পাবলিক চায় নেতারা পাশে থাকুন…’৷

মাত্ৰ ত্ৰিশ সেকেন্ডের এই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হতে সময় লাগেনি৷ এতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, মুখ্যমন্ত্ৰী শিলচরে এসে ‘মানুষ খুব খুশি’ বলে দাবি করলেও এটা তাঁর সরকার ও দলের মুখ বাঁচানোর জন্যই বলতে হয়েছিল৷ গত কয়েকদিন ধরেই তাঁর কাছে খবর যাচ্ছিল, শিলচরের ভয়ঙ্কর বিপদের সময় সাংসদ-বিধায়ককে কাছে পাননি বিধ্বস্ত মানুষ৷ দলের বহু নেতাও এ নিয়ে তাঁর কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন৷ এমনকী সংঘ পরিবারের পক্ষ থেকেও মুখ্যমন্ত্ৰীর কাছে এই দুই জনপ্ৰতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর খবর পাওয়া গিয়েছে৷ শুক্রবার দলেরই দুই বিধায়ক এমনকী রাজ্যের মন্ত্ৰী যেভাবে এই দু’জনের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্ৰীর কাছে নালিশ করলেন, এতে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে শিলচরের সাংসদ ও বিধায়কের কাজে মোটেই খুশি নয় সরকার৷ দল ও সরকারের মুখ বাঁচাতেই তাই দশদিনের মধ্যে তিন-তিনবার বরাকে আসতে হয়েছে মুখ্যমন্ত্ৰীকে৷ তিনি নিজেও তা স্বীকার করে নিয়েছেন৷ শুক্রবার শিলচরে বন্যাত্ৰাণের বিষয়টি দেখার জন্য সাংসদ ও বিধায়ককে পাশে সরিয়ে রেখে সরাসরি মন্ত্ৰী জয়ন্তমল্ল বরুয়াকে দায়িত্ব দিয়েছেন হিমন্তবিশ্ব৷ অবশ্য একবার আরেক মন্ত্ৰী পরিমল শুক্লবৈদ্যর কথাও বলেছেন৷ তবে শিলচরের ত্ৰাণ-দায়িত্ব যে জয়ন্তমল্লর ওপরই রয়েছে, এটা মুখ্যমন্ত্ৰী স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন৷

মুখ্যমন্ত্ৰীর এই উদ্যোগে বন্যাক্রান্ত মানুষের ক্ষোভ কমলেও স্থানীয় দুই জনপ্ৰতিনিধির বিরুদ্ধে কিন্তু জনক্ষোভ হ্ৰাস পাওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না৷ উল্লেখ্য, গত সপ্তাহের শুরুর দিকে ভয়ঙ্কর বন্যা যখন গোটা শহরকে কাৰ্যত গিলে খাচ্ছে, তখন এক রাতে ফেসবুকে নিজের ব্যলকনি থেকে তোলা বিলপারের বন্যার ছবি পোস্ট করেছিলেন সাংসদ ডাঃ রায়৷ এই পোস্টে তাঁকে যথেচ্ছভাবে ট্ৰোল করা হয়৷ জয়ন্তমল্ল সম্ভবত শুক্রবার সেই ফেসবুক পোস্টের কথাই মুখ্যমন্ত্ৰীকে বলছিলেন৷

এছাড়া রাজদীপবাবু নিজের ফেসবুকে ২২ জুন একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন৷ যেখানে তিনি এনডিআরএফ-এর বোট নিয়ে জল বিতরণ করতে বেরিয়েছিলেন৷ ওই ভিডিওতে কোমর জলে নেমে নৌকাটি টানতে দেখা যাচ্ছিল বিধায়ক দীপায়ন চক্রবৰ্তীকেও৷ ছোট্ট ওই ক্লিপিংয়ে সাংসদ-বিধায়কের কাছে কেউ জল চাইছিলেন (যাকে ভিডিওতে দেখা যায়নি)৷ তবে দীপায়ন তাঁকে বলে ওঠেন, ‘দোকান থেকে নিন না৷ দোকানদার কীভাবে জল আনল৷ দোকান থেকে নিন৷ একেবারেই যাদের নেই, তাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷’ সাধারণ চোখে এ এমন মন্দ কথা নয়৷ তবে ওই বিভীষিকাময় সময়ে বিধায়কের এমন প্ৰতিক্রিয়াকে মোটেও ভালভাবে নেননি শহরের মানুষ৷ অনেকেই বলেছেন, ‘ভোটের সময় এসে এঁরাই ভোট ভিক্ষে করেন, করুণ আৰ্জি রাখেন৷ অথচ এখন তাঁদের আচরণ পাল্টে গেছে৷ মানুষগুলি তখন জলের জন্য সমস্যায় বলেই তো নিজের শহরের বিধায়কের কাছে জল চাইছিল! তিনি জল না দিতে চাইলেও অন্তত সুন্দরভাবে কথাটা বলতেই পারতেন৷’

একইভাবে বন্যাবিধ্বস্ত দত্তবণিক পদবীর এক ছাত্ৰের সঙ্গে পাবলিক স্কুল এলাকায় দুৰ্ব্যবহার করেন সাংসদ রাজদীপের সঙ্গীরা৷ এ নিয়ে অভিমান জানিয়ে সেই ছাত্ৰ একটি দীৰ্ঘ ফেসবুক পোস্ট করেছিলেন৷ সেটাও প্ৰচুর ভাইরাল হয়েছে৷ সবমিলিয়ে গোটা এই বন্যায় শিলচরের সাংসদ-বিধায়কের ভূমিকা কিন্তু অনেক গল্পই রেখে দিয়ে গেল সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনে৷ টাইমলাইনে থেকে গেল এই নেতাদের নিয়ে মন্ত্ৰী থেকে মুখ্যমন্ত্ৰীর হতাশাও৷

Latest Updates

RELATED UPDATES